Mon, Jun 29, 2026
 Network
Breaking News
কাকদ্বীপে ইলিশের কৃত্রিম প্রজননে আধুনিক RAS ব্যবস্থার উদ্বোধন, গবেষণায় নতুন দিগন্তের সূচনা অবৈধ বালী পাচার রুখে দিল বিজেপি, পানাগড় সেনা ছাউনির সামনে ব্যাপক উত্তেজনা সরকারি মহিলা শৌচাগারের পথ দখলের অভিযোগ, ছাতনা থানায় স্মারকলিপি দিলেন স্থানীয় মহিলারা ঘাটাল থানার সিভিক ভলান্টিয়ারের মানবিকতা, ফিরিয়ে দিল ৪২ হাজার টাকার লটারী রাতের অন্ধকারে এগরায় স্কুলে চুরির ঘটনায় চাঞ্চল্য।

প্রাণের আলোয়

Reporter Sabyasachi By Reporter Sabyasachi May 28, 2026
প্রাণের আলোয়
মৌবনী মান্না: সুপারহিরো! শব্দটা পড়ে কী মাথায় এল? বিশাল তাগড়াই গোছের চেহারার একজন এবং যে বিশেষ কোনও শক্তি সম্পন্ন। শত্রুপক্ষকে মেরে ধুলোর মতো উড়িয়ে দেয় ইত্যাদি। সারা পৃথিবীর প্রায় সকল কমিক্স চরিত্র বোধহয় এই হিসেবেই বানানো। কিন্তু যদি এমনটা হয় যে একজন সাধারণ বুড়ো যিনি কী না ক্ষুরধার মস্তিষ্কের জেরেই হয়েছেন সুপারহিরো! চমকে গেলেন? কেন আপনাদের চাচা চৌধুরীর কথা মনে নেই? নব্বই শতকের সেই সোনা বাঁধানো দিনগুলো মনে আছে তো? যখন বইয়ের ভেতর কমিক্স ঢুকিয়ে পড়া হতো, টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে কিনতে হতো কমিক্স। আর তখন ভাল কাজের পুরস্কার হিসেবেও ছিল গল্পের বই আর কমিক্স। বাংলা কমিক্সর পাশাপাশি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ্য ছিল চাচা চৌধুরী, বিল্লু, সাবু, পিংকি নামের চরিত্ররা। আর এই সব কমিক্সের শুরুতে ছোট্ট করে একটা শব্দ লেখা থাকত - ' প্রাণ।' অনেকেই ভাবতেন ওটাও বোধহয় কমিক্স চরিত্রের নামের সঙ্গে যুক্ত। আসলে এই যে চরিত্রগুলোর কথা এতক্ষণ উল্লেখ করেছি তাঁদের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অর্থাৎ স্রষ্টা ছিলেন বিখ্যাত কার্টুনিস্ট প্রাণ কুমার শর্মা। যিনি সেই সব চরিত্রদের 'আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে' একেবারে ঘরোয়া চরিত্র বানিয়ে দিয়েছিলেন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল প্রাণ চেয়েছিলেন ভারতীয় কমিক্সকে বিদেশী আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে। তখনও দেশে সেভাবে কোনও খাঁটি দেশী সুপারহিরোর আমদানি হয়নি। যা আছে সবই বিদেশিদের থেকে ধার করা। তখন লোকে সুপারহিরো বলতে বুঝতেন 'সুপারম্যান' এবং ' ফ্যান্টম' -দের। এমন সময় ১৯৬৯ সালে প্রাণ নিয়ে এলেন বিখ্যাত সেই কমিক চরিত্র চাচা চৌধুরী। শারীরিক বল প্রয়োগ বা পেশীর জোরে দুষ্টুদের জব্দ করার চিরাচরিত রীতি যিনি পাল্টে দিলেন এক ঝটকায়। এই যুগান্তকারী চরিত্রের মাধ্যমে তিনি দেখিয়ে দিলেন পেশীর জোর নয় কেবলমাত্র বুদ্ধির জোরেই দুষ্টের দমন সম্ভব।
এহেন মানুষটি যিনি চিরকাল মানুষের হাসির খোরাক যুগিয়ে গেলেন তাঁর জীবনের শুরুর দিকটা কিন্তু একেবারেই মসৃণ ছিল না। ১৯৩৮ সালে জন্ম নেওয়া প্রাণ, ছোটবেলাতেই সাক্ষী থেকেছেন রক্তাক্ত দেশভাগের। তারপর পারিবারিক অর্থকষ্ট তো ছিলই। তার মধ্যেই বড় দাদার থেকে রং তুলি নিয়ে ছবি আঁকতেন বাড়ির দেওয়ালে। আর মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলেন এমন এক পেশাকে নিজের করবেন যেখানে ছবি আঁকার পাশাপাশি লেখাও পৌঁছে দেওয়া যায় আমজনতার দরবারে। তিনি বরাবরই লেখক ও চিত্রশিল্পীদের চেয়ে কার্টুনিস্টদের বেশি পছন্দ করতেন। কারণ তিনি কথা কম কাজ বেশি তত্ত্বেই বিশ্বাসী ছিলেন বোধহয়। তাই একবার বলেছিলেন,
' কারও কাছে লেকচার শোনার মতো সময় নেই। আমার তৈরী সকল চরিত্রই সাধারণ মানুষ।'
শুরুটা হয়েছিল অবশ্য ১৯৬০ সালে, দিল্লী থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্র 'মিলাপ'এর একজন কার্টুনিস্ট হিসেবে। 'ডাব্বু' এবং 'প্রফেসর অধিকারী' এই দুই চরিত্র তিনি ফুটিয়ে তুলতেন এই পত্রিকায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করলেও জীবন তাঁকে রাজনীতি বাদ দিয়ে একেবারে শিল্পের দোরগোড়ায় এনে দাঁড় করে দিয়েছিল। আসলে জেদ। কার্টুনিস্ট হওয়ার জেদ। আর তাছাড়া, যাঁর মাথায় এমন সব দুর্দান্ত আইডিয়া, অসাধারণ সূক্ষ্ম রসবোধ, হাজারো গল্পের বাগান তাঁর দ্বারা কি আর ওসব প্যাঁচের বিষয় সম্ভব! এবার একেবারে ১৯৬৯ সাল। প্রাণ, হিন্দী ম্যাগাজিন লটপটের জন্য সৃষ্টি করলেন আন্তর্জাতিক সেই বিখ্যাত কমিক্স চরিত্র চাচা চৌধুরী। তো জনাব, " ইয়ে কাঁহাবত তো আপনে শুনা হি হোগা-
চাচা চৌধুরী কা দিমাগ কম্পিউটার সে ভি জাদা তেজ হ্যায়।'
এবং মজার বিষয় আরেকটি প্রাণময়ী চরিত্র 'শ্রীমতী জি' আরও এক বছর আগে অর্থাৎ ১৯৬৮ সালেই সৃষ্টি করেছিলেন প্রাণ। এই চরিত্রগুলি ছাড়াও সাবু, বিল্লু, পিংকি, রামন, আর নেই নীল রঙা এবং সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র নিরামিষভোজি কুকুর রোবট কবেই যেন আমাদের ছোটবেলার পরিবারের অংশ হয়ে গিয়েছিল অজান্তেই...
কাজ করতে, কাজের মধ্যে থাকতে মারাত্মক ভালোবাসতেন প্রাণ। এমন কী শেষবার হসপিটালাইজড হওয়ার আগের দিন অব্দি কাজ করে গেছেন। আবার সেখানে অসুস্থ অবস্থায় থেকেও তিন দিন টানা কাজ করে গেছেন কমিক্সের জন্য। ২০১৪ সালে ৭৫ বছর বয়সে কোলন ক্যান্সারে আমাদের ছেড়ে চলে যান তিনি। তবে ' প্রাণের ' ঝুলি আজও আমাদের শৈশবে প্রাণখোলা আনন্দ দিয়ে গেছে অবিরত। যেখানে আছে দু'লক্ষেরও বেশি আঁকা এবং চার'শ'র বেশি কমিক্স। আর এই 'স্যান্টাক্লজের' নিজের ঝুলিতে রয়েছে , ঠিঠোলি পুরস্কার, লিমকা বুক অফ রেকর্ডস, পিপল অফ্ দ্যা ইয়ার অ্যাওয়ার্ড, এবং লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ( ইন্ডিয়ান ইনসটিটিউট অফ্ কার্টুনিস্ট) ও মরণোত্তর পদ্মশ্রী। এছাড়াও ওয়ার্ল্ড এনসাইক্লোপিডিয়া অফ্ কমিক্স এই মজার মানুষটিকে ভারতের ওয়াল্ট ডিজনী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তবে তিনি তাঁর সৃষ্টিশৈলীর মাত্রায়, ডিজনীর থেকেও হয়তো অনেক উচ্চতায় গিয়ে আমাদের মন-প্রাণ ছুঁয়ে আছেন।
এবং জেনে রাখা ভাল যে, ১৯৮৩ সালে তাঁর এক কমিক্স বই রিলিজ করেছিল - রামন- হাম এক হ্যায়। এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর তত্ত্বাবধানেই এটি সম্পন্ন হয়।
নামের মতোই তিনি যেন সত্যিকার অর্থে গোটা কার্টুন জগতের 'প্রাণ।' আমাদের বৈচিত্র্যময় ছোটবেলার অন্যতম একজন কারণ তিনি। প্রাণ চেয়েছিলেন নিত্যদিনের দুঃখ কষ্টের এই মধ্যবিত্ত জীবনে একটু হাসি-খুশীর কাঠি ছুঁইয়ে সত্যিকার একটু আনন্দ দিতে। তিনি বলতেন, "বর্তমান যুগে দৈনন্দিন জীবনযাপনে অত্যধিক ট্যাক্স এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপের জন্য জর্জরিত ভারতবাসীদের মুখে যদি একটুও হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারি, তাহলে আমি মনে করবো যে আমার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।"
উদ্দেশ্য যে সফল হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। এবং আমি বাজি ধরে বলতে পারি, এই নাম গুলো মনে করে আপনাদের মনে এক টুকরো ছোটবেলা উঁকি দিচ্ছে। মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেছে। কারণ এখনকার মতো ভিডিও গেম নয়, সোশ্যাল মিডিয়া নয়, স্মার্ট গেম নয় এইসব চরিত্রদের আঁকড়ে ধরেই আমাদের শৈশব রঙিন এক মায়াবী আলোয় কেটেছে যাঁর অন্যতম কারণ 'প্রাণ' ছোঁয়া আনন্দ।

বাজি ধরে বলা যায়, এই নামগুলো শুনে অনেকের মুখেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেছে। যারা জানেন না, তাদের জন্য বলি, এরা সব জনপ্রিয় কিছু কমিক্সের চরিত্র, যাদের আঁকড়ে ধরে অনেকের রঙিন শৈশব কেটে গেছে।