কাকদ্বীপে ইলিশের কৃত্রিম প্রজননে আধুনিক RAS ব্যবস্থার উদ্বোধন, গবেষণায় নতুন দিগন্তের সূচনা•অবৈধ বালী পাচার রুখে দিল বিজেপি, পানাগড় সেনা ছাউনির সামনে ব্যাপক উত্তেজনা•সরকারি মহিলা শৌচাগারের পথ দখলের অভিযোগ, ছাতনা থানায় স্মারকলিপি দিলেন স্থানীয় মহিলারা•ঘাটাল থানার সিভিক ভলান্টিয়ারের মানবিকতা, ফিরিয়ে দিল ৪২ হাজার টাকার লটারী•রাতের অন্ধকারে এগরায় স্কুলে চুরির ঘটনায় চাঞ্চল্য।•
সুভাষ মুখোপাধ্যায়: এ এক অন্য অকাল বোধনের গল্প
By Reporter Sabyasachi May 28, 2026
Share:
মৌবনী মান্না: সৃষ্টির মাধ্যমে-ই অমর হয়ে থাকেন স্রষ্টা। সৃষ্টি নিয়েই 'সৃষ্টি সুখের উল্লাসে' মেতে থাকে আপামর জগৎ, স্রষ্টাকে আর ক’জনই বা মনে রাখেন! কিন্তু যদি গল্পটা উল্টো হয় মানে যদি সৃষ্টির কারণে স্রষ্টার অপমৃত্যু হয়, সে ঘটনার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বোধহয় আর কিছু হয় না। শুনতে অবাক লাগলেও এমনটাই হয়েছিল এক যুগান্তকারী স্রষ্টার সঙ্গে। যাঁর সৃষ্টির কারণে তাঁকে নিতে হয়েছিল আত্মহত্যার মতো পদক্ষেপ। গবেষণায় অভাবনীয় সাফল্যের পরও তৎকালীন সরকার ও সহকর্মীদের কাছে কাজের স্বীকৃতির পরিবর্তে পেয়েছেন চরম অপমান, উপহাস আর লাঞ্ছনা, গঞ্জনা। এমনকি সহ-চিকিৎসকরাও ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন বোধ করেননি। ভাবতে অবাক লাগছে না?
যে একটা মানুষের গোটা একটা জীবন দিয়ে উৎসর্গীকৃত কাজের কেউ কোনও দাম দিল না! শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার কারণে অনেকেই সন্তান ধারণে অক্ষম আবার কেউ কেউ একটিবার সন্তান লাভের আশায় হা-পিত্যেশ করে দিন কাটাচ্ছেন নিদারুণ হতাশায়। এমন চিত্র বাংলার তথা ভারতের অনেক ঘরেই দেখতে পাওয়া যায়। সেই পরিস্থিতিতে স্বল্প সম্বলেই যে মানুষটা (ভারতের প্রথম) টেস্টটিউব বেবির মত অসাধারণ এক সাফল্যের সন্ধান দিলেন তাকেই তিলতিল করে মানসিক চাপ দিয়ে অপদস্থ করে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হলো।
এ লজ্জা কেবল বাঙালির নয়, এ লজ্জা বিজ্ঞান জগৎ তথা আপামর ভারতবাসীর। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক কালো অধ্যায় হয়ে থেকে যাবে আজীবন। আজ জাতীয় ডাক্তার দিবসে রইলো সেই প্রাপ্য না পাওয়া এক অভিমানী ডাক্তারের মর্মান্তিক জীবনকাহিনী।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা টেস্টটিউব বেবির কথা সকলেই জানেন। কিন্তু এই টেস্টটিউব বেবি প্রথম কে আবিষ্কার করেছিলেন তা হয়তো অনেকেই জানেন না। তিনি ডাক্তার সুভাষ মুখোপাধ্যায়। হ্যাঁ, এই বাঙালি বিজ্ঞানীই ছিলেন প্রথম টেস্টটিউব বেবির জনক। ১৯৭৮ সালে জন্ম হয় বিশ্বের প্রথম টেস্টটিউব বেবি লুইস ব্রাউনের যাঁর স্রষ্টা ছিলেন রবার্ট এডওয়ার্ডস এবং ঠিক এর ৬৭ দিন পর জন্ম নেন ভারতের প্রথম ও বিশ্বের দ্বিতীয় টেস্টটিউব বেবি দুর্গা ওরফে কানুপ্রিয়া আগরওয়াল, যাঁর স্রষ্টা ছিলেন আমাদের বাঙালি ডাক্তার সুভাষ মুখোপাধ্যায়। এই মানুষটি ফিজিওলজিতে স্নাতক শেষ করার পর রিপ্রোডাক্টিভ ফিজিওলজিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন রিপ্রোডাক্টিভ এন্ড্রোক্রাইনোলজির ওপর, ইউনিভার্সিটি অব এডিনব্যুরো থেকে। বিদেশে গবেষণা এবং লোভনীয় চাকরি হাতছানি দিলেও তিনি শেকড়ের টানে ফিরে এলেন ফের কলকাতাতেই। নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে শুরু করলেন কর্মজীবন। যদিও প্র্যাকটিসের চেয়ে তাঁর স্বল্প সম্বল নিয়েই গবেষণাকে প্রাধান্য দিতেন তিনি। একটা সময় এক আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে গবেষণা নিয়ে বক্তৃতার জন্য যেতে চাইলে অনুমোদন পাওয়া গেলো না খোদ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফ থেকে। কথায় আছে 'বাঙালি, বাঙালির ভালো চায় না।' এ কথা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণিত হলো এই ঘটনায়। গবেষণায় স্বীকৃতি প্রদান তো দূর অস্ত, সত্যতা নিয়েই সন্দিহান হয়ে উঠল তৎকালীন রাজ্য সরকার। পাঁচ সদস্যের এক তদন্ত কমিটি গঠিত হয় এবং সুভাষ বাবুর আজীবনের গবেষণাকে মিথ্যা বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। তাদের যুক্তি ছিল যে কাজ বিশ্বের তাবড় তাবড় দেশের ঝাঁ চকচকে ল্যাবরেটরীতে করা সম্ভব হচ্ছে না সে কাজ সুভাষ বাবু ওই ক্ষুদ্র ফ্ল্যাটের একটি ছোট ফ্রিজ আর যৎসামান্য সম্বল নিয়ে কীভাবে অসাধ্য সাধন করতে পারেন। ভাবখানা এমন, যেন তিনি এই আবিষ্কার করে অপরাধ করে ফেলেছেন। হায়রে বাঙালি!
শেষমেশ এই কমিটি জানায় সবই মিথ্যে। মিডিয়ায় তাদেরই একজন বললেন, 'ওরা যে সব পদ্ধতিতে কাজ করেছে বলছে এমন পদ্ধতিতে কেউ কখনও কাজ করেনি'। এবং এভাবেই একজন মানুষের সারাজীবন গবেষণার ফসলকে মিথ্যে, অবান্তর বলে দাগিয়ে দিতে এক মুহূর্তও লাগলো না তাদের।
এবার শাস্তিস্বরূপ তাঁকে বদলি করা হয় রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অফ অপথ্যালমোলজি তে চক্ষু বিভাগে। এবং ফলস্বরূপ তাঁকে বন্ধ করে দিতে হয় প্রজনন এবং শারীরবিদ্যা সম্বন্ধীয় গবেষণা। পরবর্তীতে তাঁকে আবারও বদলি করা হয় বাঁকুড়া মেডিকেল কলেজে। ১৯৮০ সালে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হলেও তাঁকে বদলি করা হয় আরজিকর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে যেখানে রোজ তাঁকে চারতলায় সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হতো। এরকম একজন যুগান্তকারী আবিষ্কর্তার কী এই প্রাপ্য ছিল! জাপানেও একটি সেমিনারে ডাক পেয়েছিলেন তিনি কিন্তু তৎকালীন ভারত সরকার যাওয়ার অনুমতি দেয়নি।
সালটা ১৯৮১। জুন মাসের ১৯ তারিখ। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলেন শিক্ষিকা নমিতা মুখোপাধ্যায়। বাড়ি ফিরে যা দেখলেন তাঁর জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না তিনি। চোখের সামনে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলছেন তাঁর স্বামী তথা ভারতের প্রথম টেস্টটিউব বেবির সৃষ্টিকর্তা ডাক্তার সুভাষ মুখোপাধ্যায়। সুইসাইড নোট রেখে গিয়েছিলেন তিনি যাতে লেখা, "হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর জন্য আর অপেক্ষা করতে পারলাম না"।
পশ্চিমী দেশের আবিষ্কারের কথা শুনে আমরা ভাবি আমরা কত পিছিয়ে অথচ একটা ঘরের মানুষ তাঁর ছোট্ট ফ্ল্যাটে যৎসামান্য উপকরণ নিয়ে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করলেন আর সেই মানুষটিকেই দিনের পর দিন নিজের কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে রাষ্ট্র সব জায়গায় লাঞ্ছিত, অপমানিত হতে হয়েছে দিনের পর দিন। যে কারণে তাঁর মতো একজন মানুষ নিজেকে শেষ করে দেওয়ার জন্য দু'বার ভাবেননি।
পরবর্তীতে তাঁর জীবনকাহিনী নিয়ে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র, 'এক ডক্টর কি মওত'। এছাড়াও ভারতের আরেক বিজ্ঞানী পি সি আনন্দ কুমারের ( দ্বিতীয় টেস্টটিউব বেবির সৃষ্টিকর্তা) ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ডাক্তার সুভাষ মুখোপাধ্যায় কে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের প্রথম সফল টেস্টটিউব বেবির গবেষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং আনন্দ কুমার নিজের সাফল্যের মুকুট সুভাষবাবুকে দিয়েছিলেন নির্দ্বিধায়, এ কথা বলতে দ্বিধা নেই।
দেরিতে হলেও সুভাষ বাবু তাঁর কালজয়ী কাজের স্বীকৃতি পেয়েছেন এটাই এখন সান্ত্বনার বিষয়। বেঁচে থাকলে হয়তো নোবেল পুরস্কার প্রাপ্য ছিলো তাঁর। যদিও এদিন দেখার আগেই এই অভিমানী মানুষটি পাড়ি দিয়েছিলেন সমস্ত অভিমান, সমালোচনা ও তর্ক বিতর্কের ঊর্ধ্বে।