Mon, Jun 29, 2026
 Network
Breaking News
কাকদ্বীপে ইলিশের কৃত্রিম প্রজননে আধুনিক RAS ব্যবস্থার উদ্বোধন, গবেষণায় নতুন দিগন্তের সূচনা অবৈধ বালী পাচার রুখে দিল বিজেপি, পানাগড় সেনা ছাউনির সামনে ব্যাপক উত্তেজনা সরকারি মহিলা শৌচাগারের পথ দখলের অভিযোগ, ছাতনা থানায় স্মারকলিপি দিলেন স্থানীয় মহিলারা ঘাটাল থানার সিভিক ভলান্টিয়ারের মানবিকতা, ফিরিয়ে দিল ৪২ হাজার টাকার লটারী রাতের অন্ধকারে এগরায় স্কুলে চুরির ঘটনায় চাঞ্চল্য।

সাহেব, বিবি, গোলাম ছাড়াই দশাবতার তাসের কিসসা

Reporter Sabyasachi By Reporter Sabyasachi May 28, 2026
সাহেব, বিবি, গোলাম ছাড়াই দশাবতার তাসের কিসসা
✅মৌবনী মান্না: সাহেব, বিবি গোলাম। এই শব্দবন্ধগুলো শুনলেই, মাথায় আসে একটাই জনপ্রিয় খেলার নাম। তাস খেলা। এই নেশায় বুঁদ হয়ে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কিন্তু কেমন হবে যদি এই তাসের ভেতর থেকে সাহেব, বিবি, গোলামের ঔপনিবেশিক গন্ধ মুছে ফেলা যায়? আসলে ব্রিটিশ আমলের বহু আগেই এই বাংলায় তাসের প্রচলন শুরু হয়। তাও আবার একেবারে বাংলার একেবারে স্বতন্ত্র তাস খেলা। দশাবতার তাস।
গল্পের সূত্রপাত অবশ্য অন্য ভাবে। সময়টা ১৫৬৫ সাল। মল্লভূম তথা আজকের বিষ্ণুপুরের ওপর দিয়ে শিষ্য পরিবেষ্টিত হয়ে গৌড়ের পথে চলেছেন বৈষ্ণব গুরু শ্রীনিবাস আচার্য। লুঠেরাদের হাতে পড়ে সর্বশান্ত হলেন তিনি। পুঁথিগুলিও ছাড় পেল না। জানা গেল, তৎকালীন মল্লরাজ বিরহাম্বিরের নির্দেশেই এই ঘটনা।
এদিকে তখন দিল্লীর মসনদে সম্রাট আকবর। আফগানদের সঙ্গে বেঁধেছে যুদ্ধ। রাজা বিরহাম্বির আফগানদের বিরুদ্ধে জানপ্রাণ লড়িয়ে দিলেন। আকবরের কাছের একজন হয়ে উঠলেন। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে লুট করা পুঁথিগুলোর মধ্যে আচার্যের ভাগবত পড়ে রাজা হাম্বির হয়ে উঠলেন ধার্মিক। এ যেন সেই দস্যু রত্নাকরের বাল্মীকি হয়ে ওঠার মতোই। অহিংসা হয় তাঁর মূলমন্ত্র। আর এই শ্রীনিবাস আচার্যের উৎসাহেই ওড়িশা থেকে বাংলায় শুরু হলো তাস খেলা। তবে সাহেব, বিবি, গোলাম নয়। বিষ্ণুর দশ অবতার নিয়ে তাস খেলা। আর এভাবেই খেলার মাধ্যমেই চলতে থাকল ঈশ্বরের বন্দনা।
বিষ্ণুর দশাবতার অর্থাৎ মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, রাম, ভৃগুরাম বা পরশুরাম, বলরাম, জগন্নাথ ও কল্কি। এই পৌরাণিক অবতারদের নিয়েই তৈরি হয়েছিল দশাবতার তাসের খেলা। প্রতি তাসে আঁকা থাকে এক একজন করে অবতারের মূর্তি। প্রত্যেক অবতার পিছু মোট বারোটি করে তাস, অর্থাৎ ১২০টি তাসের একটি সেট হয় দশাবতার তাসে। এই দশ তাস যেন সমাজের এক একটি স্তরের প্রতীক। সমাজের শ্রেণিবিন্যাসে যেমন ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়, এই তাসগুলির ক্ষেত্রেও সেই পার্থক্য দেখা যায়। দশ, নয়, আট, সাত, ছক্কা, পাঞ্জা, চৌকা, তিরি, দুরি, টেক্কা – এই হল বাকি তাসগুলোর ক্ষমতার বিন্যাস, যা আসলে সমাজের শ্রেণিকাঠামোকেই যেন সন্তর্পণে তুলে ধরে।
পুরনো কাপড় তেতুল বিচির আঠা দিয়ে কয়েক ভাঁজ পুরু করে জুড়ে নেওয়া হয়। শুকিয়ে গেলে দু-পাশে খড়ি মাটির প্রলেপ দিয়ে জমি প্রস্তুত করা হয়। এরপর মসৃণ পাথর দিয়ে ঘষে দু-পিঠ সমতল করা হয়। এবার নির্ধারিত মাপের গোল চাকরি করে কেটে তার ওপর অবতারের ছবি আঁকা হয় রং তুলি দিয়ে। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৮৯৫ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে লেখা, 'Notes on vishnupur Circular Cards'-এ মল্লভূমি দশাবতার তাসের আবির্ভাব কাল সপ্তম অষ্টম শতাব্দি নির্ধারণ করেন।
খেলার নিয়মাবলী সম্পর্কে জানা যায় এই খেলা অত্যন্ত জটিল। পাঁচজন খেলোয়াড় নিয়ে খেলা শুরু হয় এবং এখানে কেউ কারো সহযোগী হতে পারবেন না। খেলোয়ারদের শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করে খেলায় বসতে হয়। এই পাঁচজনের আসন ছাড়াও একটি আসন রাখা হয় ভগবান বিষ্ণুর নামে। তাস বণ্টনের কোনও তেমন নিয়ম নেই। ১২০ টি তাস ভাগ করলে প্রত্যেকের ভাগে ২৪ টি করে পড়ে। মানের বিচারে রাজা বা অবতারদের তাসগুলি হল সর্বোচ্চ। তারপর মন্ত্রী। রাম বলরাম পরশুরাম জগন্নাথ ও কল্কির ক্ষেত্রে তাদের মন্ত্রীদের দাসের পরে টেক্কার স্থান সর্বোচ্চ। তারপর যথাক্রমে দুরি, তিরি, চৌকা ইত্যাদির স্থান। দশের স্থান সর্বনিম্ন। তবে মজার বিষয়, সময় ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে তাসের মানের পরিবর্তন ঘটে। যদি দিনের বেলা হয় তাহলে স্টার্টার তাস হল রাম। রাতে মৎস। আর খেলা চলাকালীন বৃষ্টি হলে কূর্ম। এই খেলা নিয়ে অনেক গল্পগাঁথাও প্রচলিত আছে।
বীরহাম্বীর তাঁর সেনাপতি কার্তিক ফৌজদারকে দশ অবতার তাস তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর আমল থেকে আজ পর্যন্ত ফৌজদার পরিবার এই কাজ করে আসছেন। যদিও খুবই দারিদ্রের সঙ্গে দিন গুজরান করেন বিষ্ণুপুরের মনসাতলার এই পরিবার। এই পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের দশাবতার শিল্পী শীতল ফৌজদার। একমাত্র এই ফৌজদার পরিবারের প্রচেষ্টায় টিমটিম করে বেঁচে আছে দশ অবতার তাসের অস্তিত্ব। এই পরিবারটি হাত তুলে দিলেই চিরতরে হারিয়ে যাবে এই শিল্প। ওঁরা কোনও সরকারি ভাতা পান না। তেমন কোনও সুযোগ সুবিধাও পান না। তাই হয়তো অনেকটা জেদের বশেই বাঁচিয়ে রেখেছেন এই ঐতিহ্যকে।
হাজার বছরের পুরনো নগরী পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর। মল্ল রাজাদের রাজধানী। স্থাপত্য, শিল্পকলা, সঙ্গীতে সমৃদ্ধ এই নগরীর এই লুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যের কথা এখনো অনেকের অজানা। বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা মন্দির পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন শিল্পের বিজ্ঞাপনে জায়গা পেলেও, দশাবতার তাসের কোথাও যেন কোনও কদর নেই। তাহলে কি ঐতিহ্যময় এই তাসের ভবিষ্যৎ বইয়ের পাতায় আর মিউজিয়ামের কাঁচের আলমারিতে জায়গা করে নেবে? উত্তর সময়ই বলবে।